অনেকদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা–র সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তরুণ সমাজের অনেক বড় একটি অংশের। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশা এখন বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নে এসে ঠেকছে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ফল হিসেবে পরিবর্তন এলেও, রাজনীতির ময়দানে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে পরিচিত ও পুরনো শক্তিগুলো।
২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভ শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল কর্মসংস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বচ্ছ রাজনীতির দাবিতে এক সম্মিলিত আওয়াজ। রাস্তায় নেমে আসা হাজারো তরুণ বিশ্বাস করেছিল—এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জন্ম নেবে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা পুরনো ধারা ভেঙে সামনে এগিয়ে নেবে দেশকে।
কিন্তু সরকার পতনের পর সেই শূন্যতা পূরণে যে শক্তিগুলো এগিয়ে এল, তারা বেশিরভাগই নতুন নয়।
আন্দোলনের পর বিভিন্ন ছোট দল ও প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলেও, সেগুলো এখনো সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। সংগঠনগত দুর্বলতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং আদর্শগত অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে এসব নতুন শক্তি বড় রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না।
ফলে অনেক তরুণ ভোটার আবারও পরিচিত দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন, যদিও সেগুলোর সঙ্গে তাদের অতীতের হতাশা জড়িয়ে আছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সহ কয়েকটি পুরনো দল আবার মাঠে সক্রিয়। তারা সাংগঠনিক শক্তি, অভিজ্ঞতা এবং দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে সামনে এগোচ্ছে।
অনেক তরুণ ভোটারের যুক্তি—নতুন দল ভালো হলেও তারা এখনো রাষ্ট্র পরিচালনার মতো প্রস্তুত নয়। তাই বাধ্য হয়েই পুরনো দলকেই “কম খারাপ” বিকল্প হিসেবে দেখছেন তারা।
আগামী সাধারণ নির্বাচন ঘিরে তরুণ সমাজের মধ্যে এক ধরনের দ্বৈত মনোভাব দেখা যাচ্ছে। একদিকে আছে হতাশা—কারণ কাঙ্ক্ষিত নতুন রাজনীতি এখনও দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে আছে সচেতনতা—ভোট না দিলে পরিবর্তনের সুযোগও থাকবে না।
বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের বড় অংশ এবার ভোট দিতে আগ্রহী। তাদের ধারণা, অংশগ্রহণ বাড়লে অন্তত রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের দাবিকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়, তবে আলোচনা থেমে নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি বড় পরিবর্তনের পরপরই নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়া বিরল। পুরনো কাঠামো ভাঙতে সময় লাগে, লাগে ধৈর্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
তরুণদের আন্দোলন প্রমাণ করেছে—তারা শক্তিশালী এবং সংগঠিত হতে পারলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, সেই শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া।
শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই মোড় পেরিয়ে দেশ কোন পথে যাবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। তরুণরা এখনো পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে—হয়তো আগের মতো উত্তেজনাপূর্ণ নয়, কিন্তু আরও বাস্তববাদী চোখে।
এই বাস্তবতার ভেতর দিয়েই হয়তো ধীরে ধীরে তৈরি হবে সেই “নতুন বাংলাদেশ”, যার জন্য তারা একদিন রাস্তায় নেমেছিল।